পরিবেশের জন্য জীব‌নশৈলী মিশন: ভারতের জি২০ প্রেসিডেন্সির জন্য তিনটি ধারণা

ভারতের জি২০ প্রেসিডেন্সির জন্য থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ২০–র সুপারিশ
K. Seeta Prabhu

বিশ্ব এখন যে বিভিন্নমুখী সঙ্কটের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে, তা দুটি কারণে আগের সঙ্কটগুলির থেকে প্রকৃতিগতভাবে আলাদা। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘনীভূত হওয়া পরস্পর-সংযুক্ত সংকট এমন একটি নতুন গতিশীলতা তৈরি করে যা চ্যালেঞ্জিং। দ্বিতীয়ত, সম্পদ–নিবিড় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পিছনে দৌড়নোর কারণে মানবসৃষ্ট সঙ্কটটি নিজেই অসমতা, পরিবেশ ধ্বংস ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বিশ্বকে এমনভাবে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে যে আমরা সব কিছু স্বাভাবিক বলে আর ভাবতে পারি না। উন্নয়নের এই অসম ও অস্থিতিশীল পথ থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে হলে উন্নয়নের আরও ন্যায়সঙ্গত ও স্থিতিশীল পথের দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। ভারত চলতি জি২০ প্রেসিডেন্সির থিম হিসাবে সকলের মঙ্গলের জন্য পরিবেশ, স্থিতিস্থাপকতা ও মূল্যবোধভিত্তিক জীবনধারার থিম প্রস্তাব করেছে, এবং এই উদ্দেশ্যে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ২০ (টি২০)–এর মধ্যে টাস্ক ফোর্স ৩ গঠন করা হয়েছে। ব্যক্তির ব্যবহারে পরিবর্তন আনার বিষয়ে টাস্ক ফোর্সের মনোভাবের পরিপূরক হতে হবে বৈশ্বিক স্তরে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলির দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যশৈলীর পরিবর্তন। টি–টোয়েন্টির বিবেচনার জন্য এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

১। ন্যায্য রূপান্তর থেকে ন্যায্য পুনরুদ্ধারের দিকে যাওয়া


বিশ্বকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতীয় সরকারগুলির কোভিড–পরবর্তী নীতি পদক্ষেপগুলির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করতে হবে, এবং সে জন্য ন্যায্য উত্তরণের প্রয়াসের বাইরে বেরিয়ে ন্যায্য পুনরুদ্ধারের পথে যেতে হবে। জরুরি  আবশ্যিকতা হল এমন একটি উন্নয়ন কাঠামোয় স্থানান্তর করা যা সমতা ও  স্থিতিশীলতার মূল মূল্যবোধকে সম্মান করে, এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত করার উপায় হিসাবে দেখে। মানব উন্নয়ন মাপকাঠি সমতা ও স্থায়িত্বকে এর  মূল মূল্য হিসাবে বিবেচনা করে। সমতা বলতে পছন্দ, স্বাধীনতা ও সুযোগের ক্ষেত্রে একটি প্রজন্মের মধ্যে এবং আন্তঃপ্রজন্ম সমতা উভয়কেই বোঝায়। স্থিতিশীলতা পরিবেশগত মাত্রার পরিধির বাইরে যায়, এবং এর মধ্যে  অর্থনৈতিক ও সামাজিক মাত্রাগুলিও অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাছাড়া এটি শক্তিশালী স্থিতিশীলতার ধারণাকে মেনে চলে, যা ‘‌গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মূলধন’‌ সংরক্ষণকে অপরিহার্য বলে মনে করে;‌ এর বিপরীতে দুর্বল স্থিতিশীলতার ধারণায় প্রাকৃতিক ও ভৌত পুঁজিকে একে অপরের বিকল্প হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

মানব উন্নয়ন পদ্ধতির উপাদানগুলিকে ইতিমধ্যেই জাতীয় সরকারগুলি সামাজিক ক্ষেত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বা দারিদ্র্য বিমোচন ও ‘‌কল্যাণমূলক’‌ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ব্যবহার করছে। যাই হোক, এগুলির মধ্যে এখনকার উন্নয়ন মাপকাঠি বিপরীতমুখী করার পরিবর্তে বিদ্যমান উন্নয়নের প্রতিক্রিয়াগুলি মোকাবিলা করার প্রবণতা দেখা যায়। এই আংশিক ও দ্বিধাগ্রস্ত দৃষ্টিভঙ্গির অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে, কারণ কল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলি ততক্ষণ সফল হতে পারে না যতক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিগুলিকে নব্য উদারনৈতিক কাঠামোর ছাঁচে ঢালা অব্যাহত থাকবে এবং সেগুলি অসমতা ও অস্থিতিশীল ফলাফল তৈরি করতে থাকবে। যা প্রয়োজন তা হল ‘‌সমস্ত’‌ নীতির — আর্থিক, রাজস্ব, আয় ও অন্যান্য — নিয়ন্ত্রণকারী মূল মূল্য হিসাবে থাকবে সমতা ও স্থায়িত্ব, যাতে সেগুলি শুধু একক প্রজন্মগত নয়, আন্তঃপ্রজন্মগত বিবেচনা–সহ একটি ‘‌পুনর্বণ্টনমূলক নীতি’‌ দ্বারা চিহ্নিত হয়। এটি এসডিজি ও অ্যাজেন্ডা ২০৩০–এর অর্জনকে সক্ষম করতে পারে, যা বর্তমানে বহুমুখী সংকটের কারণে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২। প্রকল্পের মূল্যায়নে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলির নিয়মগুলি বদলানো এবং সেই ডিসকাউন্ট রেটগুলির দিকে এগিয়ে চলা যা ‘‌নেট শূন্যের জন্য শূন্যের কাছাকাছি’‌

উপরোক্ত বিষয়গুলি অনুসরণ করে লাইফ (‌LiFE)‌–এর আবশ্যিকতাগুলির জন্য যা প্রয়োজন তা হল প্রাকৃতিক পুঁজির সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া৷ একে বাস্তবে পরিণত করতে হলে অপারেশনাল স্তরে এই জাতীয় মূলধন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এমন নিয়ম ও মূল্যায়ন মাপকাঠিগুলি গ্রহণ করা অপরিহার্য। বর্তমানে খরচ–সুবিধা (‌কস্ট–বেনিফিট)‌ বিশ্লেষণের জন্য বেশিরভাগ দাতা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলির দ্বারা ব্যবহৃত নিয়মগুলি, যা প্রকল্প নির্বাচন ও মূল্যায়নের জন্য একটি ‘‌বৈজ্ঞানিক’‌ পদ্ধতি হিসাবে বিবেচিত হয়, ৩–৭ শতাংশের মধ্যে ছাড়ের হার (‌ডিসকাউন্ট রেট)‌ ব্যবহার করে হয় মূলধনের সুযোগ খরচ (অপরচুনিটি কস্ট)‌ বা ছাড়ের সামাজিক হার (‌সোশ্যাল রেট অফ ডিসকাউন্ট)‌ প্রতিফলিত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলির প্রতি একটি পদ্ধতিগত পক্ষপাত তৈরি হয়, কারণ পরিবেশগত ও বাস্তুতন্ত্রগত পুনরুদ্ধার সাধারণত ৫০ বছর বা তারও  বেশি সময় ধরে প্রসারিত একটি প্রক্রিয়া। তাই নেট শূন্য গ্রিনহাউস নির্গমনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য পরিবেশের পুনরুদ্ধার ও জীবনশৈলীকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি ছাড়ের হার‌ প্রয়োগ করার প্রশ্নে বিস্তৃত ঐকমত্য ও উদ্যোগ অপরিহার্য।

ব্যক্তির না–থাকলেও সমাজের সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ লালন করার। প্রায়–শূন্য ছাড়ের হার গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগত ও পদ্ধতিগত পক্ষপাতের অবসান করা যায়। অধিকন্তু, খরচ–সুবিধা বিশ্লেষণ হল একটি হাতিয়ার যা প্রান্তিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রাসঙ্গিক, কিন্তু সমগ্র সমাজের সঙ্গে  সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলির জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। এবং তাই বর্তমান অস্তিত্ব সংকটের প্রেক্ষাপটে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যদিও স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয়, সকল স্তরেই শূন্যের কাছাকাছি ছাড়ের হার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য, আমরা বিশ্বব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর  জোর দিই কারণ রাজনৈতিক ইচ্ছা বা এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থান প্রায়শই স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে পাওয়া যায় না।। নিম্ন স্তরে একটি ‘‌সম্মিলিত মায়োপিয়া’‌ রয়েছে, যা নির্বাচনী রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে দীর্ঘ নির্মাণপর্ব প্রয়োজন এমন প্রকল্প অনুমোদনের বিরুদ্ধে একটি পদ্ধতিগত পক্ষপাতের দিকে পরিচালিত করে। এই নির্বাচনী রাজনীতির বাধ্যবাধকতা রাজনৈতিক দলগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক লাভের দিকে মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করে।

অধিকন্তু, যেহেতু বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির যুক্তিসঙ্গত মুনাফা অর্জনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সুস্পষ্ট চুক্তি ছাড়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হবে, তাই দীর্ঘমেয়াদে শূন্য–সুদে অর্থায়নের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী অর্থায়নের বিকল্পগুলি অনুসন্ধান করতে হবে। এর ফলে দেশগুলি সক্ষম হবে সমাজের জন্য এবং বৃহত্তর বিশ্বের জন্য অপরিমেয় মূল্যের প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন করতে।

৩। ‘‌প্রগতি’‌ পরিমাপের মাপকাঠি পরিবর্তন করা

স্টিগলিটজ–ফিতুসি–সেন কমিশনের বিখ্যাত ডিকটাম — ‘আমরা যাকে মূল্য দিই তা-ই আমরা পরিমাপ করি’ — ভুল পরিমাপের বিষয়টিকে চিহ্নিত করে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত দেশগুলি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি একটি দেশের ‘‌অগ্রগতি’‌ পরিমাপের জন্য মাথাপিছু জিডিপি ব্যবহার করে চলেছে, ততক্ষণ বিকাশের পদ্ধতিতে কোনও পরিবর্তন হবে না। অসমতা ও পরিবেশগত অবনতি যে এখনও পর্যন্ত অনুসৃত বৃদ্ধিভিত্তিক উন্নয়নের সরাসরি উপ–পণ্য হিসাবে এসেছে, সে কথা বিবেচনায় রেখে লাইফ (‌LiFE)‌–কে বাস্তবে পরিণত করতে হলে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মানগুলিকে সরাসরি প্রতিফলিত করে এমন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া অপরিহার্য। অগ্রগতিকে ‘‌সবুজ জিডিপি’‌র পরিপ্রেক্ষিতে পরিমাপ করতে হবে, এবং গ্রহের উপর চাপ ও অসমতার প্রেক্ষিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। মানব উন্নয়ন সূচকটিকে ইতিমধ্যেই এই দুটি মাত্রার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে মূল জিডিপি পরিমাপকে সমন্বিত করা অপরিহার্য। অসমতার প্রেক্ষিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাথাপিছু আয় এবং গ্রহের উপর চাপের প্রেক্ষিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ জিডিপি বৈশ্বিক পর্যায়ে লাইফ–এর ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এক বিশাল পদক্ষেপ হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন উপরোক্ত সব বিষয়কে বাস্তবে পরিণত করার জন্য অপরিহার্য। ভারতের জি২০ প্রেসিডেন্সি সকলের জন্য মঙ্গলময় যুগের সূচনা করার লক্ষ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ যুগান্তকারী ধারণাগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে।